বিবাহ বিচ্ছেদ — শুধু দুজনের আলাদা হওয়া নয়, এটা একটা গোটা পরিবারের ভেঙে পড়া
আমরা যখন বিবাহ বিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের কথা শুনি, তখন সাধারণত মাথায় আসে দুটো মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়ার ছবি। একজন স্বামী, একজন স্ত্রী — দুজনে আর একসাথে থাকতে পারলেন না, পথ আলাদা হয়ে গেল। কিন্তু ব্যাপারটা কি সত্যিই এতটুকুই? আসলে তা নয়। ডিভোর্স মানে শুধু দুজন মানুষের বিচ্ছেদ নয় — এটা একটা পুরো পরিবারের ভাঙন। একটা গোটা সংসারের ভিত নড়ে যাওয়া। এমন অনেক মানুষের বুকে আঘাত লাগে, যাদের কথা আমরা ভাবিই না।
আজকে একটা ভিডিও দেখলাম, দেখে বুকটা চিনচিন করে উঠল। একজন বয়স্ক দাদা — তাঁর ছোট্ট নাতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। এমন কান্না, যেটা দেখলে পাথরের বুকেও চিড় ধরে। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন সম্ভবত তাঁর ছেলের সাবেক স্ত্রী। হয়তো এটাই শেষবারের মতো দেখা। এরপর আর এই ছোট্ট নাতির মুখটা দেখার সুযোগ হবে কি না, সেটা আল্লাহই জানেন। ভিডিওটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত ভারী অনুভূতি।
ডিভোর্স শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে আঘাত করে না। এর ধাক্কা আরো অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছায়। একবার ভাবুন তো — একটা তালাক হলে কী কী হয়? দাদা-দাদির সাথে নাতি-নাতনির যে মায়ার বন্ধন ছিল, সেটা এক নিমেষে ছিন্ন হয়ে যায়। সেই শাশুড়ি, যিনি পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রেখেছিলেন, তিনি হারিয়ে ফেলেন আরেকটা মেয়েকে। শ্বশুর হারান এমন একজনকে, যাকে সন্তানের মতোই দেখতেন। কিন্তু জানেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা হয়? নিষ্পাপ শিশুরা। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা, যারা এই পৃথিবীটাকে এখনো ঠিকমতো চিনতেই পারেনি — তারা হঠাৎ দেখে তাদের পৃথিবীটা দুভাগ হয়ে গেছে। বাবা একদিকে, মা আরেকদিকে। ওরা বুঝতেই পারে না কেন এমন হলো, কী দোষ ছিল ওদের।
ইসলাম এই বিষয়টাকে কিভাবে দেখেছে?
ইসলামে তালাক বা ডিভোর্সকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়নি — কারণ জীবনে এমন পরিস্থিতি আসতেই পারে যেখানে একসাথে থাকা সত্যিই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ইসলাম এটাকে একেবারে শেষ পদক্ষেপ হিসেবে রেখেছে। সর্বশেষ উপায়। যখন আর কোনো রাস্তা নেই, তখনই কেবল এই পথে যেতে বলা হয়েছে। এর আগে কুরআনে কী বলা হয়েছে দেখুন — সবর করতে বলা হয়েছে, ধৈর্য ধরতে বলা হয়েছে। ইসলাহ বা সংশোধনের চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। পরিবারের বড় ও বিশ্বস্ত মানুষদের ডেকে মধ্যস্থতা করাতে বলা হয়েছে — উভয় পক্ষ থেকে একজন করে প্রতিনিধি পাঠিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। কারণ আল্লাহ তা'আলা ভালো করেই জানেন — একটা তালাক কত মানুষের জীবনে কত গভীর ক্ষত তৈরি করে। সেই ক্ষত হয়তো সারাজীবনেও পুরোপুরি সারে না।
হয়তো আমরা যদি একটুখানি বেশি ধৈর্য ধরতাম। হয়তো আমরা যদি ছোটোখাটো বিষয়গুলো একটু বেশি মেনে নিতে শিখতাম। হয়তো আমরা যদি সম্পর্কটাকে বাঁচানোর জন্য আরেকটু চেষ্টা করতাম, আরেকটু কষ্ট সহ্য করতাম — তাহলে অনেক পরিবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেত। অনেক দাদা তাঁর নাতির জন্য বুক ফাটিয়ে কাঁদতেন না। অনেক শিশু বাবা-মা দুজনকে একসাথে পাশে পেয়ে বেড়ে উঠতে পারত।
পরিবার টিকিয়ে রাখা একটা জিহাদ। হ্যাঁ, জিহাদ শব্দটা ভারী শোনালেও এটাই সত্যি। প্রতিদিন ছোটো ছোটো অভিমান গিলে ফেলা, রাগ চেপে রাখা, নিজের ইগো-কে পায়ে মাড়িয়ে একটু হেসে কথা বলা — এগুলো সহজ কাজ না। কিন্তু এই কঠিন কাজটা করা আমাদের প্রত্যেকের ঈমানি দায়িত্ব। কারণ একটা পরিবার যখন ভাঙে, তখন শুধু দুজন মানুষ আলাদা হয় না — অসংখ্য হৃদয় ভেঙে যায়... আর সেই ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া লাগানো কখনো কখনো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিবারের হক আদায় করার, ধৈর্য ধারণ করার এবং সম্পর্ককে সুন্দরভাবে টিকিয়ে রাখার তৌফিক দান করুন। আমীন।